Print World Header Banner 2

Miscellaneous

তাফসিরের আলোকে রমজানের রাত্রিঃ লাইলাতুল কদরের মহিমা

27-03-2025

তাফসিরের আলোকে রমজানের রাত্রিঃ লাইলাতুল কদরের মহিমা

রমজান মাস হচ্ছে কুরআন নাজিলের মাস। আর এই মাসেই রয়েছে এমন এক রাত্রি—লাইলাতুল কদর, যার গুরুত্ব, ফজিলত ও রহস্য নিয়ে কুরআনে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাজিল হয়েছে: সূরা আল-কদর

আল্লাহ তাআলা কুরআনে এই রাতের গুরুত্ব বোঝাতে বলেছেন—

"লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম" (সূরা আল-কদর: ৩)

এই ব্লগে আমরা আলোচনা করবতাফসিরের আলোকে লাইলাতুল কদরের ব্যাখ্যা, এর মহিমা, আল্লাহর বিশেষ রহমত, রমজানের শেষ দশকের গুরুত্ব এবং কীভাবে আমরা এই রাতকে উপযুক্তভাবে কাজে লাগাতে পারি।

সূরা আল-কদরের আয়াত ও অর্থ

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ
١. إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ
২. وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ
٣. لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ
٤. تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ
٥. سَلَامٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطْلَعِ الْفَجْرِ

অর্থ:

১। নিশ্চয়ই আমি এ (কুরআন) নাযিল করেছি কদরের রাতে।

২। আপনি কী জানেন, কদরের রাত কী?

৩। কদরের রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।

৪। ঐ রাতে ফেরেশতাগণ এবং জিবরাঈল (আ.) প্রত্যেক বিষয়ে তাদের পালনকর্তার অনুমতিক্রমে অবতরণ করেন।

৫। শান্তি, শুধু শান্তি, যা সুবহে সাদিক (ফজরের সূর্য ওঠা) পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

তাফসিরের আলোকে লাইলাতুল কদরের ব্যাখ্যা

১. “إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ”

এই আয়াতের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পূর্ণ কুরআন একত্রে লাওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার নিকটবর্তী আসমানে 'বাইতুল ইজ্জা'য় নাজিল করেছেন লাইলাতুল কদরের রাতে।
এরপর সময় ও প্রয়োজন অনুযায়ী ২৩ বছরে রাসূল (সা.)-এর উপর নাজিল করা হয়েছে।

২. “وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ”

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা রাতটির মাহাত্ম্য তুলে ধরেছেন। রাসূল (সা.)-এর মতো ব্যক্তিত্বও জানতেন না এই রাতের প্রকৃত গুরুত্ব—এ কথা উল্লেখ করে সাধারণ মুমিনদের গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য জোর দেয়া হয়েছে।

৩. “لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ”

হাজার মাস = প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাস!
এত বছরের ইবাদতের ফজিলত এক রাতেই অর্জিত হতে পারে—এমন সুযোগ একমাত্র লাইলাতুল কদরেই মেলে।

৪. “تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا”

এই রাতে ফেরেশতারা, বিশেষ করে জিবরাঈল (আ.), আল্লাহর হুকুম নিয়ে দুনিয়াতে অবতরণ করেন।

- তারা মুমিনদের জন্য রহমত, বরকত ও সান্ত্বনা নিয়ে আসেন।

- প্রতিটি ভালো কাজের গৃহীত হওয়ার দোয়া ও সুসংবাদ দেন।

৫. “سَلَامٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطْلَعِ الْفَجْرِ”

এই রাতটিতে পূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তা বিরাজ করে।

- গুনাহ মাফের সুযোগ

- আল্লাহর নৈকট্য লাভ

- শয়তানদের বাধা প্রদান

Laylatul-Qadr: Multiply Your Blessings - Islamic Relief SA

কেন লাইলাতুল কদর এত গুরুত্বপূর্ণ?

কুরআনের নাজিল হওয়া:
কুরআনের মতো শ্রেষ্ঠ কিতাবের আগমন এ রাতকে বিশেষ মর্যাদার আসনে বসিয়েছে।

১। গোনাহ মাফের সুযোগ:
হাদিসে এসেছে:

"যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের প্রত্যাশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদত করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়।"
— (সহিহ বুখারি)

২। ফেরেশতা অবতরণ:
এই রাতে প্রতিটি কল্যাণের ঘোষণা ও দোয়া গ্রহণ করা হয়।

৩। সুন্নাহ অনুসারে সন্ধান:
রাসুল (সা.) সাহাবিদের বলেন,

“তোমরা লাইলাতুল কদরকে রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে সন্ধান করো।”
— (বুখারি)

লাইলাতুল কদর খুঁজে পাওয়ার করণীয়

শেষ দশকে ইতিকাফে বসা:

রাসুল (সা.) শেষ দশকে নিয়মিত ইতেকাফ করতেন কদরের রাত পাওয়ার আশায়।

তাহাজ্জুদ, নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত:

রাত্রির বেশিরভাগ সময় ইবাদতে কাটানো।

বিশেষ দোয়া:

আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করলে, রাসুল (সা.) দোয়া শিখিয়েছিলেন—
“হে আল্লাহ! তুমি পরম ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা করতে ভালোবাসো, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।”

দান-সদকা ও ভালো কাজ:

সদকার সওয়াবও হাজার মাসের সমান। গরিবকে সাহায্য, ইফতার করানো, মসজিদে দান করা ইত্যাদি।

লাইলাতুল কদরের রাত—বিজ্ঞান ও বাস্তবতায়

আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে মানুষ যত বেশি গভীর রাতে ধ্যান, ধ্যানাভ্যাস ও একাগ্রতা করে, তার শরীর ও মনের ওপর ভালো প্রভাব পড়ে।

- রাত্রির প্রশান্ত পরিবেশ ইবাদত ও আত্মিক সংযোগের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।

- রাতের এই সময়ে হৃদয় সবচেয়ে সংবেদনশীল থাকে।

আজকের তরুণদের প্রতি আহ্বান

প্রযুক্তির এই যুগে আমাদের সময় কাটে সোশ্যাল মিডিয়া, বিনোদন ও দুনিয়াবি ব্যস্ততায়। অথচ আল্লাহ আমাদের জন্য বরাদ্দ করেছেন এমন একটি রাত—যা গোটা জীবন বদলে দিতে পারে।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আসুন:

- এই বরকতময় রাতটিকে গেইম, নাটক বা ফেসবুকে নয়, বরং সেজদায় কাটাই।

- দোয়ার মাধ্যমে নিজেকে পরিবর্তনের প্রেরণা দিই।

- আমাদের পিতা-মাতার জন্য, মৃত আত্মীয়দের জন্য, এবং পুরো উম্মাহর জন্য দোয়া করি।

উপসংহার

লাইলাতুল কদর শুধু একটি রাত নয়; এটি হলো আল্লাহর এক বিশাল নিয়ামত। যে ব্যক্তি এই রাতকে উপলব্ধি করে, ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করে—সে নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যবান।

এই রাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া মানে একটি নতুন আত্মার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। এক রাতে যদি আপনার জীবন, ভবিষ্যৎ এবং আখিরাত বদলে যায়, তবে সেটাই হবে জীবনের সেরা রাত।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে লাইলাতুল কদরের ফজিলত অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

Previous Post

Next Post

Related Posts

ইতেকাফের বিধান ও রমজানের শেষ দশকের গুরুত্ব

27-03-2025

Miscellaneous

ইতেকাফের বিধান ও রমজানের শেষ দশকের গুরুত্ব

রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য সবচেয়ে বরকতময়, রহমতপূর্ণ...

Read More
স্বাধীনতার ৫০+ বছর পরও ২৬ মার্চ আমাদের কী শেখায়?

25-03-2025

Miscellaneous

স্বাধীনতার ৫০+ বছর পরও ২৬ মার্চ আমাদের কী শেখায়?

প্রতি বছর ২৬ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন...

Read More
ঈদের প্রস্তুতি ও কেনাকাটার ট্রেন্ডঃ অনলাইন বনাম অফলাইন...

24-03-2025

Miscellaneous

ঈদের প্রস্তুতি ও কেনাকাটার ট্রেন্ডঃ অনলাইন বনাম অফলাইন...

ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোর একটি। এক মাস...

Read More

Trending

About MAWblog

MAWblog strives to provide a platform for authors, reporters, business owners, academics, people who do writing as a hobby and concerned citizens to let their voices be heard by a wider community. Our goal is to publish contents that are in line with our core goals of promoting sustainable business practices, improving community harmony and facilitating knowledge sharing and ethical labour market practices.

We invite you to write and publish under any of our nine chosen categories and make an impact towards building a better and more sustainable future.

Sign Up for Our Weekly Fresh Newsletter