Print World Header Banner

Miscellaneous

ইতেকাফের বিধান ও রমজানের শেষ দশকের গুরুত্ব

27-03-2025

ইতেকাফের বিধান ও রমজানের শেষ দশকের গুরুত্ব

রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য সবচেয়ে বরকতময়, রহমতপূর্ণ ও মাগফিরাতের মাস। এই মাসের শেষ দশ দিন আরও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মধ্যে রয়েছে ‘লাইলাতুল কদর’ নামক এক মহিমান্বিত রাত, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আর এই মহিমান্বিত রাত ও শেষ দশকের বরকত অর্জনের একটি বিশেষ ইবাদত হলো ইতেকাফ

ইতেকাফ মানে দুনিয়াবি কাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে মসজিদে আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে নিয়োজিত রাখা। এটি রাসুল (সা.)-এর নিয়মিত সুন্নাহ, যা তিনি জীবনের শেষ সময়ে কখনও ছেড়ে দেননি। এই ব্লগে ইতেকাফের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ, বিধান, উদ্দেশ্য, ফজিলত, রমজানের শেষ দশকের গুরুত্ব, এবং আমাদের করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

ইতেকাফের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ

শাব্দিক অর্থ:
ইতেকাফশব্দটি আরবি ‘আকা-ফা-ফা’ (عَكَفَ) মূলধাতু থেকে উদ্ভূত, যারঅর্থহলো 'কোনো কিছুরপ্রতি অটলথাকা', ‘নিজেকে নিবিষ্টরাখা’, কিংবা 'নির্জনভাবে অবস্থানকরা'।

ইসলামি পরিভাষায়:
শরিয়তের দৃষ্টিতে ইতেকাফ হল ইবাদতের নিয়তে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করা এবং দুনিয়াবি কাজ থেকে বিরত থেকে শুধু আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে নিবিষ্ট রাখা।

ইতেকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত

রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর থেকে জীবনের শেষ রমজান পর্যন্ত নিয়মিতভাবে শেষ দশকে ইতেকাফ করতেন।

হাদিসে এসেছে:
"আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) জীবনের শেষ দশকে নিয়মিত ইতেকাফ করতেন। তিনি ওফাত পর্যন্ত এর ওপর অবিচল ছিলেন এবং তাঁর ওফাতের পর তাঁর স্ত্রীগণও ইতেকাফ করতেন।" — সহিহ বুখারি


লাইলাতুল কদর পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম হল ইতেকাফ। কারণ রাসুল (সা.) বলেন,


“তোমরা লাইলাতুল কদরকে রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে খোঁজ করো।” (বুখারি)


ইতেকাফে একজন বান্দা নিজেকে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করে। এটি আল্লাহর প্রেম অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।

ইতেকাফের প্রকারভেদ

১. ওয়াজিব ইতেকাফ:

কেউ মান্নত করলে সেটি পালন করা বাধ্যতামূলক হয়।
উদাহরণ: “আমি যদি এই পরীক্ষায় পাস করি তবে ৩ দিন ইতেকাফ করব।”

২. সুন্নাতে মুআক্কাদা (রমজানের শেষ দশকে):

- এটি রাসুল (সা.)-এর নিয়মিত সুন্নাহ।

- একটি এলাকায় কেউ একজন যদি পালন করে, তাহলে অন্যরা দায়মুক্ত হয়। না করলে পুরো সমাজ গোনাহগার হয়।

৩. নফল ইতেকাফ:

- রমজান বা অন্য যে কোনো সময়ে ইচ্ছাকৃতভাবে মসজিদে ইবাদতের নিয়তে অবস্থান করা।

- এটি ছোট সময়ের জন্যও হতে পারে, যেমন এক ঘণ্টা বা একদিন।

ইতিকাফের নিয়ম ও পদ্ধতি (ভিডিও)

রমজানের শেষ দশকের গুরুত্ব

১. লাইলাতুল কদর

- কদরের রাত হলো এমন একটি রাত যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম (সূরা কদর)।

- এই রাতে ইবাদত করলে ৮৩ বছরের ইবাদতের সমান সওয়াব লাভ হয়।

- এটি একমাত্র রাত যা কেবল রমজানের শেষ দশকেই আসে।

২. তাওবার শ্রেষ্ঠ সময়

- এ সময় আল্লাহর রহমতের দরজা ব্যাপকভাবে খোলা থাকে।

- পাপ থেকে মুক্তি ও জান্নাত লাভের উপযুক্ত সময়।

৩. আত্মশুদ্ধির সময়

- আত্মিক উন্নতির জন্য রমজানের শেষ দশক এক অনন্য সুযোগ।

- অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার সময় এটি।

ইতেকাফ পালনের শর্তাবলি ও নিয়ম

পুরুষদের জন্য:

- শুধুমাত্র মসজিদেই ইতেকাফ করা যাবে।

- যেখানে জামাতের নামাজ হয়, এমন মসজিদে অবস্থান করতে হবে।

নারীদের জন্য:

- ঘরের একটি নির্দিষ্ট স্থানকে ‘ইতেকাফের স্থান’ হিসেবে নির্ধারণ করতে পারেন (যদি ঘরেই নামাজ পড়ার ব্যবস্থা থাকে)।

সময়কাল:

রমজানের ২০ তারিখ মাগরিবের সময় থেকে শুরু করে ঈদের চাঁদ দেখা পর্যন্ত (১০ দিন)।

নিয়ত:

ইতেকাফ শুরু করার সময় মনে মনে নিয়ত করতে হবে:
“আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ করছি।”

ইতেকাফে কী করা উচিত?

- কুরআন তিলাওয়াত

- জিকির, তাসবিহ, তাওবা

- নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায়

- নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ

- ইসলামিক বই পড়া

- লাইলাতুল কদরের জন্য বিশেষ দোয়া করা

বিশেষ দোয়া (আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত):

اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ العَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
“হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে পছন্দ করেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন।”

ইতেকাফ ভঙ্গের কারণসমূহ

- বিনা প্রয়োজনে মসজিদ ত্যাগ

- স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস বা চুম্বন

- রোজা ভেঙে ফেলা (রমজানে ইতেকাফে রোজা ফরজ)

- পাপের কাজে লিপ্ত হওয়া

- বিনা প্রয়োজনে মোবাইল, টিভি, গেমস, বা ফেসবুক ব্যবহার (মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায়)

ইতেকাফে অংশগ্রহণের কিছু বাস্তব উপকারিতা

আত্মশুদ্ধি ও আত্মবিশ্লেষণ:
ব্যস্ত জীবনের ভিড়ে আমরা নিজেদের ভুলে যাই। ইতেকাফে সময় পেলে মানুষ নিজের ভুল-ত্রুটি বুঝতে পারে।

রহমত ও মাগফিরাতের সুযোগ:
আল্লাহ এই সময় বান্দার দোয়া কবুল করেন বেশি।

পরিবারে ইবাদতের উৎসাহ সৃষ্টি:
এক সদস্য ইতেকাফ করলে অন্যরাও ইবাদতে অনুপ্রাণিত হয়।

উপসংহার

রমজানের শেষ দশক এবং ইতেকাফ আমাদের আত্মিক উন্নয়নের এক অপূর্ব সুযোগ। এই সময়টিতে আল্লাহ আমাদের দিকে বেশি করে ফিরছেন, আমাদের ডাক শুনছেন, ক্ষমা করতে প্রস্তুত।

ইতেকাফ এমন একটি ইবাদত যা মন, মনন ও আত্মাকে নির্মল করে। আসুন, আমরা এই পবিত্র রমজানে অন্তত একবার এই সুন্নাহ আদায় করার চেষ্টা করি এবং নিজের সঙ্গে আল্লাহর সম্পর্ককে আরও গভীর করি।

আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে রমজানের বরকতপূর্ণ সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে ইতেকাফ ও লাইলাতুল কদরের ফজিলত অর্জন করার তাওফিক দেন। আমিন।

Previous Post

Next Post

Related Posts

তাফসিরের আলোকে রমজানের রাত্রিঃ লাইলাতুল কদরের মহিমা

27-03-2025

Miscellaneous

তাফসিরের আলোকে রমজানের রাত্রিঃ লাইলাতুল কদরের মহিমা

রমজান মাস হচ্ছে কুরআন নাজিলের মাস। আর এই মাসেই রয়েছে এমন...

Read More
স্বাধীনতার ৫০+ বছর পরও ২৬ মার্চ আমাদের কী শেখায়?

25-03-2025

Miscellaneous

স্বাধীনতার ৫০+ বছর পরও ২৬ মার্চ আমাদের কী শেখায়?

প্রতি বছর ২৬ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন...

Read More
ঈদের প্রস্তুতি ও কেনাকাটার ট্রেন্ডঃ অনলাইন বনাম অফলাইন...

24-03-2025

Miscellaneous

ঈদের প্রস্তুতি ও কেনাকাটার ট্রেন্ডঃ অনলাইন বনাম অফলাইন...

ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোর একটি। এক মাস...

Read More

Trending

About MAWblog

MAWblog strives to provide a platform for authors, reporters, business owners, academics, people who do writing as a hobby and concerned citizens to let their voices be heard by a wider community. Our goal is to publish contents that are in line with our core goals of promoting sustainable business practices, improving community harmony and facilitating knowledge sharing and ethical labour market practices.

We invite you to write and publish under any of our nine chosen categories and make an impact towards building a better and more sustainable future.

Sign Up for Our Weekly Fresh Newsletter