Print World Header Banner 2

International

ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেন্ট কি? রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেভাবে ধ্বংস করে বিদেশী বিনিয়োগ

Written by: এস এম নাহিয়ান

20-03-2025

ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেন্ট কি? রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেভাবে ধ্বংস করে বিদেশী বিনিয়োগ


আজকের বিশ্বে যদি আপনার ব্যবসাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিতে চান, তাহলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বৈদিশিক বিনিয়োগ।  একটা সময় ছিল যখন কোনো ব্যবসাতে বিনিয়োগ করতো সেই ব্যবসার মালিক নিজে, আর তার পরিচিতজনেরা। সময়ের সাথে ব্যবসায়ীর বদলে এখন মুখ্য বিনিয়োগকারী হয়ে গেছে ব্যাংক, আর অন্যান্য অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। আর বৈশ্বায়নের এই যুগে বিনিয়োগের গন্ডিটা দেশের সীমানা ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। 


কিন্তু ভিন্ন একটি দেশে বিনিয়োগ করা আসলে কতটা নিরাপদ? কোনো দেশে বিনিয়োগ করার আগে বিনিয়োগকারী আসলে কি কি দেখে সিধান্ত নেন? এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই আসে ‘ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেটের’ কথা। 


ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট কি?

কোনো দেশ বা অঞ্চলের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক তথা সামগ্রিক অবস্থা যেভাবে ওই দেশের বিনিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে, সেটিই ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট। সেই বিনিয়োগ হতে পারে কোনো ব্যক্তি, ব্যাংক, অথবা কোনো নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান থেকে। 


ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট বিষয়টি মূলত বিদেশী বিনিয়োগের জন্যই বেশি প্রয়োজনীয়। কারণ এটি দিয়ে কোনো দেশ বিনিয়োগের জন্য কতটা উপযুক্ত, সেটিকেই বোঝানো হয়।


যেসব বিষয়ের উপর ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট নির্ভর করে 

এখন প্রশ্ন চলে আসে যে, একটি দেশের ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট আসলে কিসের উপর ভিত্তি করে নির্ণয় করা হয়। এক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি সূচক রয়েছে। আর সেই সূচকগুলোকে মোটা দাগে বেশ কিছু ক্ষেত্রে ভাগ করা যায়। 




অর্থনৈতিক অবস্থা 

অর্থনৈতিক স্থিতি

অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে, বিনিয়োগের জন্য প্রথমেই যেটি দেখা হয়, সেটি অর্থনৈতিক স্থিতি। অর্থাৎ আপনাদের দেশের অর্থনীতি কতটুকু স্থিতিশীল, গত কয়েক বছরের তুলনায় বর্তমানে এর বৃদ্ধি কেমন, মুদ্রাস্ফীতির হার কেমন, বৈদিশিক ঋণের পরিমাণ কতটুকু, এ সব কিছুর মাধ্যমেই একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ধারণ করা যায়। 


মার্কেট সাইজ 

বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিশালী দিক এর বিশাল মার্কেট সাইজ। মূলত বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যা আর বিশাল মার্কেট অনেক বিদেশী বিনিয়োগ আনার কারণ। 

আইনী পরিস্থিতি 

দ্বিতীয় যেই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়, সেটি হলো আইনী পরিস্থিতি। এর ভেতর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় হলোঃ 


কোম্পানি আইন 

ইদানীংকালে ইপিজেডগুলোতে শতভাগ বিদেশী বিনিয়োগে কোম্পানি স্থাপনের সুযোগ বাংলাদেশ সরকার দিয়েছে। কিন্তু আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোম্পানি স্থাপন সংক্রান্ত আইনগুলো নবায়ন করার অনেক সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বিদেশী বিনিয়োগকারী যদি বাংলাদেশী আইনের কারণে নিজের বিনিয়োগকে নিরাপদ না মনে করে, তাহলে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নেমে আসে শূণ্যের কোঠায়। 


আইনী জটিলতা 

যদি আইনী স্বচ্ছতা আর দ্রুতগতিতার কথা হিসেব করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারেই তলানিতে। আর সেটা বাংলাদেশের ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেটের উপরে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। কারণ যেকোনো ধরনের আইনী জটিলতা, একজন বাংলাদেশীর জন্য যতটা কঠিন, তার থেকে বহুগুণে কঠিন একজন বিদেশীর জন্য। 


অবকাঠামো

একটি দেশে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে, আরও একটি বিষয় অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। সেটি, অবকাঠামো। বিনিয়োগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থানে অবশ্যই সর্বাধুনিক কারখানা গড়ে তোলা যায়। কিন্তু দেশের পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ কোনো বিনিয়োগকারীর নেই। 


যেমন বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থার কথাই ধরা যাক। বাংলাদেশের এক চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই অধিকাংশ সমুদ্র বাণিজ্য হয়ে থাকে। আর মংলা ও পায়রা বন্দর পিছিয়ে থাকার অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম কারণ হলো, যাতায়াত ব্যবস্থা। এছাড়াও সঠিক অবকাঠামোর অভাবে, চাইলেও বাংলাদেশে অনেক আধুনিক প্রযুক্তি আনাটা সমিচীন নয়। 


চিত্রঃ খুলনা-মংলা রেলব্রিজ যা মংলা বন্দরের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করবে 

শ্রম বাজার

সবার শেষে শ্রম বাজার নিয়ে একটু কথা না বললেই না। কারণ যেকোনো দেশে একটি পণ্যের উৎপাদন খরচ কেমন হবে তা অনেকটুকু নির্ভর করে সেই দেশের শ্রম বাজারের উপরে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের এতটা উন্নতির কারণে কিন্তু রয়েছে আমাদের শস্তা শ্রম। 


বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যেখান থেকে সবথেকে কম খরচে, ভাল পণ্য বানিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সেখানেই বিনিয়োগ করে। একই সাথে শ্রম বাজারকে পুরোপুরি অদক্ষ হলেও চলে না। দক্ষতা এবং মজুরির একটা সুষম মিশ্রণই পারে বিদেশী বিনিয়োগ এনে দিতে। 



কেন রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর 

কিন্তু উপরের সব কিছুকে ছাপিয়ে একটি জিনিস, যেকোনো দেশের ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেটের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারে। সেটি রাজনৈতিক অস্থিরতা। উপর্যুক্ত প্রতিটি সমস্যাই কোনো না কোনো ভাবে সমাধানযোগ্য। 


কিন্তু কোনো দেশে যদি রাজনৈতিক সহিংসতা থাকে, তাহলে তা একজন বিদেশী বিনিয়োগকারীর জন্য সবচেয়ে বড় বাঁধা। কেন? 


অনিশ্চয়তা

সবচেয়ে বড় কারণ হলো, অনিশ্চয়তা। একটি দেশে, বা বিশেষ করে বাংলাদেশে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা চলে, তখন পুরো দেশের অবস্থা খুব অনিশ্চিত হয়ে যায়। আর অনিশ্চিত পরিবেশে কেউই কখনো নিজের টাকা খাটাতে চায় না। 


ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থবির হওয়া

যেকোনো ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে বেশি জরুরী হলো সেই ব্যবসার মানুষ আর কাঁচামাল। মানুষ না আসলে পণ্য তৈরি হবে না। আর কাঁচামাল না আসলে, পণ্য তৈরি করার কিছু থাকবে না। কিন্তু বাংলাদেশ, শ্রীলংকার মতো দেশগুলো যখন রাজনৈতিক ভাবে অস্থির হয়ে যায়, তখন প্রথমেই বন্ধ হয় পরিবহন ব্যবস্থা। 



আর বর্তমান যুগে সাপ্লাই চেইন বন্ধ হলে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সমস্ত ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। 


চাহিদার পরিবর্তন

রাজনৈতিক সহিংসতার আরেকটি বিশাল সমস্যা হলো, চাহিদার পরিবর্তন। যখনই একটি দেশে রাজনৈতিক সমস্যা দেখা দেয়, তখনই তার একটি প্রভাব জনমনে পড়ে। আর সেই নেতিবাচক প্রভাবটা গিয়ে দেখা দেয় তাদের চাহিদাতে। 


মানুষ যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত আর অতিরিক্ত সাবধানী থাকে, তখন সে স্বভাবতই খরচ করতে চায় না। আর তাই আপনার ব্যবসা যদি নিত্য-প্রয়োজনীয় পণ্যের বাহিরে অন্য কিছুর হয়ে থাকে, তাহলে এই চাহিদার পরিবর্তনের প্রভাব অবশ্যই আপনার ব্যবসাতে পড়বে। 


আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা

কিন্তু উপরের সবকিছুর চেয়েও যেটিকে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বেশি ভয় পায়, সেটি হলো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। বিশেষ করে অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান অনেক খরচ করে বিশাল ব্যবসা গড়ে তোলার পরেও, সে দেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। এর ভেতর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো রাশিয়া। একের পর একে নিষেধাজ্ঞার কারণে, অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড রাশিয়াতে তাদের ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। 



আর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আসার সবচেয়ে বেশী সুযোগ তৈরি হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সহিংসতার কারণে। বিশেষ করে রাজনৈতিক কারণে একটি দেশে মৃত্যুর সংখ্যা যত বেশি, সেই দেশের নিষেধাজ্ঞায় পড়ার সম্ভাবনা তত বেশি। 


তবে শুধু নিষেধাজ্ঞাই নয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যেকোনো দেশ থেকে বিনিয়োগকৃত টাকাও তুলে আনা অনেক কঠিন। কারণ অনেক সময়ই সেসব দেশের বৈদিশিক মুদ্রা বিনিময়, কঠোর ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। ঠিক যেমনটি বাংলাদেশ। 


শেষকথা 

সব মিলিয়ে এটুকু বলা যায়, বাংলাদেশের উন্নতি করতে হলে বৈদিশিক বিনিয়োগ অপরিহার্য। কিন্তু তা এমনি এমনি আসবে না। বিশেষ করে বাংলাদেশের ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট যতদিন না অবধি সব দিক থেকে উন্নত হবে, ততদিন অবধি এদেশে বিনিয়োগের হার আশানুরূপ হবে না। আর স্বভাবতই, বাংলাদেশ সহ যেকোনো দেশের ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট আর বিজনেস ক্লাইমেট ঠিক রাখার প্রথম শর্ত হবে, সেদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে রাখা। 

Previous Post

Next Post

Related Posts

ইলন মাস্ক কিভাবে ট্রাম্প প্রশাসনে এত প্রভাবশালী

18-03-2025

International

ইলন মাস্ক কিভাবে ট্রাম্প প্রশাসনে এত প্রভাবশালী

বিশ্বের এক নম্বর ধনী ইলন মাস্কের নাম শোনে নি, এমন মানুষ...

Read More
গোয়েন্দা সংস্থা কি সরকার পতন করাতে পারে? সিআইএ-পৃথিবীর...

12-02-2025

International

গোয়েন্দা সংস্থা কি সরকার পতন করাতে পারে? সিআইএ-পৃথিবীর...

সিআইএ, নামটা শোনেননি এমন কেউ হয়তো নেই। পৃথিবীর সেরা...

Read More
কেমন হতে যাচ্ছে ট্রাম্পের শাসনামল?

02-02-2025

International

কেমন হতে যাচ্ছে ট্রাম্পের শাসনামল?

ট্রাম্প হোয়াইট হাউজের দায়িত্ব নেওয়ার দিন দশেক হয়ে গেছে।...

Read More

Trending

About MAWblog

MAWblog strives to provide a platform for authors, reporters, business owners, academics, people who do writing as a hobby and concerned citizens to let their voices be heard by a wider community. Our goal is to publish contents that are in line with our core goals of promoting sustainable business practices, improving community harmony and facilitating knowledge sharing and ethical labour market practices.

We invite you to write and publish under any of our nine chosen categories and make an impact towards building a better and more sustainable future.

Sign Up for Our Weekly Fresh Newsletter