Print World Header Banner 2

International

ইলন মাস্ক কিভাবে ট্রাম্প প্রশাসনে এত প্রভাবশালী

Written by: এস এম নাহিয়ান

18-03-2025

ইলন মাস্ক কিভাবে ট্রাম্প প্রশাসনে এত প্রভাবশালী


বিশ্বের এক নম্বর ধনী ইলন মাস্কের নাম শোনে নি, এমন মানুষ হয়তো কমই আছে। কিন্তু এতদিন আমরা ব্যবসায়ী ইলন মাস্ককে চিনে আসলেও, এখন দেখতে পাচ্ছি প্রশাসক ইলন মাস্ককে। শুধু প্রশাসক নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের নীতি-নির্ধারণী হর্তাকর্তাও হয়ে উঠছেন ইলন মাস্ক। যা দিন শেষে সুবিধা দিচ্ছে ইলনের প্রায় অর্ধ ডজন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে। 


কিন্তু ইলন মাস্কের অবস্থার এই পরিবর্তনে , তার ব্যবসাগুলো আসলে ঠিক কতটা লাভবান? আর শুধু কি আন্তর্জাতিক ব্যবসা, নাকি পরিবর্তন আসছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও। ইলন মাস্কের এই আরোহণ পশ্চিমা দেশগুলোর আধুনিক ইতিহাসে আসলে এক বিরল ঘটনা। কারণ পর্দার আড়ালে থাকার বদলে ব্যবসায়ী ইলন মাস্ক, এখন খুব পরিষ্কার ভাবেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন। 


ট্রাম্প প্রশাসনে ইলন মাস্কের ভূমিকা এখন কি? 

ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার দায়িত্ব গ্রহণের পরেই নতুন যেই ডিপার্টমেন্টটি খুলেছেন, সেটি ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নেন্স ইফিসিয়েন্সি (Department of Government Efficiency)। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ইউএস ডিজিটাল সার্ভিসের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ইউএস ডোজ (U.S. DOGE)। 


অনেকের মতে, এটি আসলে ইলন মাস্কেরই ব্রেইন চাইল্ড। কিন্তু আমেরিকান সরকার সেটা স্বীকার করতে নারাজ। এমনকি ইলন মাস্ককে যে সরাসরি এর সাথে জড়িত, তাও স্বীকার করতে নারাজ ট্রাম্প প্রশাসন। বরং ইলন মাস্কের পদবি হলো ‘সিনিয়র অ্যাডভাইজর টু দি প্রেসিডেন্ট’ (Senior Advisor to the President) বা উপদেষ্টা।  


কিন্তু একজন উপদেষ্টা হওয়ার মাধ্যমে কিভাবে এত ক্ষমতা বেড়ে গেল ইলন মাস্কের? 


যা যা করেছে ইলন মাস্ক 

ইলন মাস্কের ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট ইফিসিয়েন্সির মূল কাজ হলো, আমেরিকান সরকারের ফেডারেল এজেন্সিগুলোর খরচ কমানো। কিন্তু খরচ কমানোর নামে প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের উপর অবাধে ছড়ি ঘোড়ানোর লাইসেন্স পেয়ে গেছে ইলন মাস্ক। অন্তত আপতদৃষ্টিতে তাই মনে হচ্ছে। যদিও ডোজের (DOGE) এখতিয়ার আসলে কতটুকু, সে নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানের ফাইল চেক করা এবং বিনা নোটিশে সরকারি কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত করার আইনী ও সাংবিধানিক অধিকার আছে কি না, সে নিয়েও তুমুল সমালোচনা চলছে এখন যুক্তরাষ্ট্রে। 


তবে সবকিছুর মাঝেও, এখন পর্যন্ত অনেক আমেরিকান সরকারি প্রতিষ্ঠানের উপরেই খড়গ নেমেছে। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুইটি হলোঃ 


ইউএসএইড (USAID) 

ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (United States Agency for International Development) কে বাংলাদেশের জনগণ হয়তো খুব বেশি চেনে না। কিন্তু যারা এনজিওগুলোর সাথে কাজ করেছে, তারা সবাই এক নামে এটিকে চেনে। 


২০২৪ সালেও ইউএসএইড থেকে বাংলাদেশের পাওয়া ফান্ডের পরিমাণ ছিল ৯১ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা থেকে শুরু করে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ইত্যাদি নানা খাতে ছিল এই ফান্ডের বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এসেই পুরো বিশ্বব্যাপী ইউএসএইডের সমস্ত ফান্ডিং বন্ধ করে দিয়েছে। 


ফান্ডিং বন্ধ করেই ক্ষান্ত হয় নি, বর্তমানে ইলন মাস্ক নিজ দায়িত্বে পুরো সরকারি প্রতিষ্ঠানটিকে ধংস্ব করছে। ইউএসএইডের ৪,৭০০ আমেরিকান কর্মচারীকে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ লিভে পাঠানো হয়েছে। চাকরিচ্যুত করা হয়েছে আরও ১,৬০০ কর্মচারীকে। এছাড়াও বিভিন্ন দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ইউএসএইড থেকে যেই টাকা পেতো, তার কোনোটাই আর পরিশোধ করা হচ্ছে না। 


ইউএসএইডের ব্যাপারে ইলন মাস্ক এক্স (টুইটার) প্ল্যাটফর্মে লেখেনঃ 


ডিপার্টমেন্ট অফ এডুকেশন 

ইউএসএইডের পরেই সবচেয়ে বেশি যেই সরকারি প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, সেটি ডিপার্টমেন্ট অফ এডুকেশন। প্রতিষ্ঠানটির ‘ইন্সটিটিউট অফ এডুকেশন সায়েন্সেস’ এর প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার ফান্ডিং বন্ধ করে দিয়েছে, যা ওই প্রতিষ্ঠানের গবেষণা বাজেটের প্রায় ৮৯%। এর ফলে পুরো আমেরিকার শিক্ষা ও গবেষণা খাতে ভয়াবহ প্রভাব পড়তে যাচ্ছে। 


এছাড়াও ট্রাম্প প্রশাসন কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার ফান্ড বন্ধ করে দিয়েছে। এ ব্যাপারে অভিযোগ ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়টি তাদের ইহুদী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যার্থ হয়েছে। 


এছাড়াও সেন্টার অফ মেডিকেয়ার, কনজ্যুমার ফিনানশিয়াল প্রটেকশন ব্যুরো, ডিপার্টমেন্ট অফ ডিফেন্স, ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি, ইন্টার্নাল রেভিনিউ সার্ভিস, ন্যাশনাল ইন্সটিউট অফ হেলথ, ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট এর মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় সব ধরনের তথ্যের অধিকার পেয়েছে ইলন মাস্ক। একই সাথে চলছে কর্মী ছাটাই, আর বাজেট কমানো। 


আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কি প্রভাব 

এখন মনে হতে পারে, এগুলো সবই আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিষয়। হ্যা, অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও, ইলন মাস্কের প্রভাব কিন্তু শুধু আমেরিকার ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। বরং তার প্রভাব এখন ছড়িয়ে পড়ছে পুরো বিশ্বে। আর সেই প্রভাবটি এখন আর ব্যবসায়িক প্রভাব নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব। 


রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ 

সম্প্রতি পোলিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী র‍্যাড’স্ল সিকরস্কির (Radslaw Sikorosky) সাথে তীব্র বাক-বিতন্ডায় জড়িয়েছে ট্রাম্প। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যোগাযোগ রক্ষার জন্য প্রথম থেকেই ইউক্রেনীয় সেনারা স্টারলিংকের ইন্টারনেট ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু জেলেনস্কি শান্তি প্রস্তাবে রাজি না হলে স্টারলিংক সেবা বাতিলের হুমকি দিয়েছে ইলন মাস্ক। 



কিন্তু এ নিয়ে প্রতিবাদ করেছে পোল্যান্ড। কারণ ইউক্রেনীয় সেনাদের জন্য স্টারলিংকের খরচ বহন করেছে পোল্যান্ড। এ নিয়ে একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বাক-বিতন্ডায় যাওয়ার পর তাকে ‘ছোট মানুষ’ বলে সম্বোধন করে ইলন বলেন ‘‘Be quiet, small man’। কিন্তু একজন ব্যবসায়ী, সে যত বড় মাপের ব্যবসায়ীই হোক না কেন, এমন স্পর্ধা দেখানোর কথা না। 


ভিন্ন দেশের রাজনৈতিক দলকে সমর্থন

শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেই নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যাপারেও এখন বেশ সরব ইলন মাস্ক। অতি সম্প্রতি এক নাজি স্যালুট দেওয়ার মাধ্যমে ভয়াবহ তোপের মুখে পড়ে সে। যদিও তার দাবি অনুযায়ী সেটা ছিল একটা সাধারণ স্যালুট। খোদ বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও তাকে এই ইস্যুতে সমর্থন করেন। 


কিন্তু কিছুদিন আগেই জার্মানির একটি কট্টর ডানপন্থী দলের অনুষ্ঠানে দেখা গেছে ইলনকে। সেই দলটির নাম ‘এএফডি পার্টি’। ইলনের ভাষ্যমতে “শুধু এএফডি পার্টিই পারে জার্মানিকে বাঁচাতে’। এসবের পাশাপাশি এখন ইলন সমর্থন করছে যুক্তরাজ্যের ডানপন্থী দলকেও। চীনের তাইওয়ান দখল করা এবং রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল করা নিয়েও সমর্থনের সুর পাওয়া গেছে তার কথায়। এমনকি আর্জেন্টিনার ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলেই (Javier Milei) এর মুদ্রাস্ফীতি কমাতে দেশের বাজেট কমানোর সিধান্তকেও মডেল হিসেবে দেখেন ইলন। আর ভবিষ্যতে আমেরিকাতেও নাকি এমনই পদক্ষেপ নেওয়ার ইচ্ছা আছে ইলন মাস্কের, এমনটাই দাবি করেছেন ক্রিস্টোফার রোডস নামের হার্ভাড ইউনিভার্সিটির এক লেকচারার। 


কিন্তু ক্যারিয়ারের প্রায় পুরো সময় জুড়ে অরাজনৈতিক থেকে, হটাৎ করেই এত রাজনৈতিক হয়ে যাচ্ছেন কেন ইলন মাস্ক? 


আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব 

ইলন মাস্ক কিন্তু শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছেন না, সেই সাথে প্রভাব ফেলছেন ব্যবসাতেও। খুব ছোট একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। অতি সম্প্রতি আফ্রিকা মহাদেশে স্টারলিংকের ব্যাপক বিস্তৃতি লক্ষ্য করা গেছে। আর সাথে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, ট্রাম্পের কাছে আফ্রিকান মহাদেশে খুবই কম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। 


তাই অনেক পত্র-পত্রিকায় এমনও অভিযোগ উঠেছে যে, ট্রাম্প প্রশাসনে ইলনের বিপুল প্রভাবকে কাজে লাগিয়েই, আফ্রিকার  রেগুলেটরি বিষয়গুলোকে দ্রুত পাশ কাটিয়ে এত দ্রুত ব্যবসা বৃদ্ধি করতে পারছে স্টারলিংক। 


তবে শুধু এটাই বিষয় নয়। ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট ইফিসিয়েন্সির বদৌলতে ইলন বিনা ঝামেলায় সমস্ত আমেরিকান ফেডারেল এজেন্সির তথ্য পাচ্ছে। ফলে সকল ধরনের ব্যবসায়িক তথ্য, উপাত্তও চলে যাচ্ছে ইলনের কাছে। যদিও ট্রাম্পের ভাষ্যমতে ইলন মাস্ককে এমন কোনো তথ্যে পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না যেখানে তার ব্যবসায়িক লাভের আশংকা আছে। কিন্তু কথাটা শুধু মুখেই সীমাবদ্ধ। 



কারণ ইলনের ব্যবসা শুধু একটি খাতে সীমাবদ্ধ নয়। তার ব্যবসা রয়েছে অটোমোটিভ ইন্ডাস্ট্রিতে, রয়েছে স্পেস অ্যান্ড অ্যারোস্পেসে, এনার্জি সেক্টরে, এআই ডেভেলপমেন্টে, টেলিকমিউনিকেশনে, টুইটারের মত সোশ্যাল মিডিয়াতে। সুতরাং যেকোনো ডাটার মাধ্যমেই তার কোনো না কোনো ব্যবসা লাভবান হবে। সব মিলিয়ে আমেরিকান প্রশাসনের মাধ্যমে ইলন যে আন্তর্জাতিক ব্যবসাতে কিছুটা হলেও মোড় ঘোরাতে সক্ষম হবে, তা বলাই বাহুল্য।


কিন্তু কিভাবে এত ক্ষমতা?  

এত কিছুর পরে সব শেষে মনে যেই প্রশ্নটা ঘুরপাক খায় সেটি হলো, ইলনের ট্রাম্পের উপর এত প্রভাব কিভাবে? কোথায় তার ক্ষমতার উৎস। এর উত্তর পেতে হলে ফিরে যেতে হবে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার সময়। ট্রাম্পের ইলেকশন ক্যাম্পেইনে, শুধু ইলন মাস্ক একাই খরচ করেছে ২৬০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। 

অর্থাৎ সহজ ভাষায়, এই ২৬০ মিলিয়ন ডলার ছিল একটি বিনিয়োগ। আর ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর, একজন ব্যবসায়ী হয়ে সকল সরকারি দপ্তরের উপর ছড়ি ঘোরানোর ক্ষমতাটা ছিল, ইলন মাস্কের লাভ। আর এভাবেই, বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনে সবচেয়ে কর্তাব্যাক্তি হয়ে উঠেছে, ইলন মাস্ক। 

Previous Post

Next Post

Related Posts

ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেন্ট কি? রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেভাবে...

20-03-2025

International

ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেন্ট কি? রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেভাবে...

আজকের বিশ্বে যদি আপনার ব্যবসাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে...

Read More
গোয়েন্দা সংস্থা কি সরকার পতন করাতে পারে? সিআইএ-পৃথিবীর...

12-02-2025

International

গোয়েন্দা সংস্থা কি সরকার পতন করাতে পারে? সিআইএ-পৃথিবীর...

সিআইএ, নামটা শোনেননি এমন কেউ হয়তো নেই। পৃথিবীর সেরা...

Read More
কেমন হতে যাচ্ছে ট্রাম্পের শাসনামল?

02-02-2025

International

কেমন হতে যাচ্ছে ট্রাম্পের শাসনামল?

ট্রাম্প হোয়াইট হাউজের দায়িত্ব নেওয়ার দিন দশেক হয়ে গেছে।...

Read More

Trending

About MAWblog

MAWblog strives to provide a platform for authors, reporters, business owners, academics, people who do writing as a hobby and concerned citizens to let their voices be heard by a wider community. Our goal is to publish contents that are in line with our core goals of promoting sustainable business practices, improving community harmony and facilitating knowledge sharing and ethical labour market practices.

We invite you to write and publish under any of our nine chosen categories and make an impact towards building a better and more sustainable future.

Sign Up for Our Weekly Fresh Newsletter