Print World Header Banner

Sustainable Development

বাংলাদেশে স্টারলিংক আসায় কাদের লাভ? কত খরচ হবে স্টারলিংকে

Written by: এস এম নাহিয়ান

13-03-2025

বাংলাদেশে স্টারলিংক আসায় কাদের লাভ? কত খরচ হবে স্টারলিংকে


১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে প্রধান উপদেষ্টা ড মুহাম্মদ ইউনূস, ইলন মাস্কের সাথে অনলাইন মিটিং করার পর থেকেই বাংলাদেশে বয়ে যাচ্ছে জল্পনা-কল্পনার ঝড়। কবে বাংলাদেশে আসছে স্টারলিংক? রয়েছে অনেক আলোচনা-সমালোচনাও। আদৌ কি বাংলাদেশে স্টারলিংকের দরকার আছে কিনা, সে নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। 


২০১৯ সালের ২৩শে মে যাত্রা শুরু করে, স্টারলিংক এখন সারাবিশ্বে পরিচিত। শুধু পরিচিতি বললে ভুল হবে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগের জন্য এখন এটিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। এমনকি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে, ইউক্রেনের যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেকটাই স্টারলিংকের উপর নির্ভরশীল। 


স্টারলিংক কিভাবে কাজ করে? 

কিন্তু স্টারলিংক আসলে কিভাবে কাজ করে? উত্তরটা খুব সহজ। স্টারলিংক একটি স্যাটেলাইট ভিত্তিক ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার। স্টারলিংকের মূল প্রযুক্তিটাও নতুন কিছু না। বরং অনেক আগে থেকেই পৃথিবীতে স্যাটেলাইট ভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি হিউসনেট (HughesNet) নামক একটি কোম্পানি সেই ১৯৯৬ সাল থেকেই এরকম সেবা দিয়ে আসছে। 


কিন্তু তাহলে স্টারলিংকে নিয়ে এত মাতামাতি কেন! কারণ এর নতুনত্ব আর গতি। এক ঝলকে যদি স্টারলিংকের প্রযুক্তিটা বুঝতে চান তাহলে বিষয়টা দাঁড়াবে অনেকটা এরকমঃ 


১। স্পেসএক্সের মাধ্যমে প্রথমেই স্টারলিংকের অসংখ্য স্যাটেলাইট মহাকাশে ছড়ানো হয়েছে। বর্তমানে স্টারলিংক স্যাটেলাইটের সংখ্যাটা ৭,০০০। তবে ভবিষ্যতে তা ৪০,০০০ পার করবে। 


২। এই স্যাটেলাইটগুলোর অরবিট বা গতিপথ, পৃথিবী থেকে মাত্র ৩০০ মাইল দূরে। দূরত্ব কম হওয়ার কারণে এই স্যাটেলাইট থেকে আসা সিগনালে ল্যাটেন্সি কম। ফলে গতিও বেশি। 


৩। নতুন স্টারলিংক স্যাটেলাইটগুলোর লেজার কমিউনিকেশন মডিউল আছে। এজন্য স্যাটেলাইট থেকে স্যাটেলাইটে সহজে যোগাযোগ করতে পারে। অর্থাৎ এর মাধ্যমে গ্রাউন্ড স্টেশনগুলোর উপর নির্ভরতা কমে যাচ্ছে। 




৪। কয়েকটি বড় বড় স্যাটেলাইট ব্যবহারের বদলে স্টারলিংকের কৌশল হলো, ছোট ছোট অনেকগুলো স্যাটেলাইট ব্যবহার করা। এগুলো কিউবস্যাট (CubeSats) নামে পরিচিত। 


৫। আপনি যখন গ্রাউন্ড স্টেশনের মাধ্যমে কিউবস্যাটে যোগাযোগ করছেন, তখন কিউবস্যাট নেটওয়ার্কের সাথে আপনি যুক্ত হয়ে যাচ্ছেন। আপনার ডাটা ট্রান্সফার হচ্ছে সেই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। অর্থাৎ এখান থেকে আমেরিকাতে ডাটা পাঠাতে হলে সেটার জন্য মধ্যবর্তী গ্রাউন্ড স্টেশন ব্যবহারের কোনো দরকার নেই। স্যাটেলাইট সরাসরি সেটা আমেরিকার গ্রাউন্ড স্টেশনে পাঠাবে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটা যথেষ্ট দ্রুত গতির। 


যা যা প্রয়োজন 


এই পুরো প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হতে আপনার প্রয়োজন হবে একটি স্টারলিংক কিট। কিটে থাকবেঃ 


১। স্টারলিংক এন্টেনা, 

২। কিকস্ট্যান্ড 

৪। জেনারেশন থ্রি স্টারলিংক রাউটার, 

৫। স্টারলিংক ক্যাবল 

৬। এসি ক্যাবল 

৭। পাওয়ার সাপ্লাই।


স্টারলিংক এন্টেনাটি একটি ইলেক্ট্রনিক ফেজড অ্যারে এন্টেনা (Electronic Phased Array)। ওয়াটারপ্রুফ এই অ্যান্টেনাটি মাইনাস ৩০ ডিগ্রি থেকে ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় কাজ করতে পারে। সহ্য করতে পারে ঘন্টায় ৯৬ কিলোমিটার বাতাসের বেগ। আর এটা চালাতে বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় ঘন্টায় ৭৫ থেকে ১০০ ওয়াট। যা আপনার বাসার একটি লাইটের সমান। 



কত খরচ

কিন্তু স্টারলিংকের প্রশ্নে সবচেয়ে বড় বাঁধা, এর খরচ। এত খরচের কারণে আদৌ বাংলাদেশে এটির সার্ভিস বেশিদিন চলবে কি না, সে নিয়ে অনেকের সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু খরচ কত সে প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অনেক পত্রিকাই সরাসরি আমেরিকার সাথে তুলনা করছে। 


কিন্তু বাস্তবে স্টারলিংকের খরচ দেশভেদে পরিবর্তিত হয়। দেশভেদে স্টারলিংকের খরচ বাংলাদেশি টাকায় কত হয় সেটার একটা চিত্র আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। 


মহাদেশ 

দেশ 

হার্ডওয়্যারের খরচ 

মাসিক খরচ (সর্বনিম্ন) 

বাংলাদেশি টাকা 

নর্থ আমেরিকা 

যুক্তরাষ্ট্র 

৫৯৯ ডলার 

১২০ ডলার 

হার্ডওয়ারঃ ৭২,৭৫৩

মাসিকঃ ১৪,৫৭৫ 

মেক্সিকো 

৮৩০০ পেসো 

১১০০ পেসো 

হার্ডওয়ারঃ ৪৯,৮০২

মাসিকঃ ৬,৬০০

ইউরোপ 

যুক্তরাজ্য 

৪৯৯ পাউন্ড 

৭৫ পাউন্ড 

হার্ডওয়ারঃ ৭৮,৪২২

মাসিকঃ ১১,৭৮৭

জার্মানি 

২৯৯ ইউরো 

৫০ ইউরো 

হার্ডওয়ারঃ ৩৯,৬১৪

মাসিকঃ ৬,৬২৪

ফ্রান্স

৪৫০ ইউরো

৪০ ইউরো 

হার্ডওয়ারঃ ৫৯,৬২০

মাসিকঃ ৫,২৯৯

এশিয়া 

জাপান 

৫৫০০০ ইয়েন 

৬,৬০০ ইয়েন 

হার্ডওয়ারঃ ৪৫,১২৫

মাসিকঃ ৫,৪১৫

মালয়েশিয়া 

২৩০০ রিঙ্গিত 

২২০ রিঙ্গিত 

হার্ডওয়ারঃ ৬৩,০৬৫

মাসিকঃ ৬,০৫৮

ভুটান 

৩৩,০০০ গুলট্রাম

৪২০০ গুলট্রাম

হার্ডওয়ারঃ ৪৫,৯৬৩

মাসিকঃ ৫,৮৪৯

আফ্রিকা 

যাম্বিয়া

১০,৭৪৪ কোয়াচা 

৭৭১ কোয়াচা 

হার্ডওয়ারঃ ৪৫,৬৩৯

মাসিকঃ ৩,২৭৫

নাইজেরিয়া 

২৯৯,৫০০ নাইরা 

৩৮,০০০ নাইরা 

হার্ডওয়ারঃ ২৩,৬৭২

মাসিকঃ ৩০০০ 

দেখতেই পাচ্ছেন, অঞ্চল ভেদে স্টারলিংকের খরচের বেশ তফাত রয়েছে। একইসাথে তফাত রয়েছে সার্ভিসের গুণগত মানে। এই তালিকায় উল্লেখ করা খরচগুলো আসলে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সর্বনিম্ন খরচ। এ তালিকা থেকে বোঝাই যাচ্ছে, আমেরিকা-ইউরোপের তুলনায় এশিয়া-আফ্রিকার খরচ বেশ কিছুটা কম। 



এখানে বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছাকাছি তুলনা হতে পারে ভুটান। কারণ প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে কাছে। আর ভুটানের স্টারলিংক সার্ভিসও চালু হয়েছে  ২০২৫ সালে। ভুটানে স্টারলিংকের মাসিক খরচ প্রায় ৬০০০ হাজার টাকার মতো। বাংলাদেশেও যদি মাসিক খরচটা ৫-৬ হাজারের মাঝে রাখা সম্ভব হয়, তাহলে স্টারলিংকের টিকে থাকার সম্ভাবনা আছে। 


তবে এরকম ব্যক্তিগত প্যাকের বাইরেও স্টারলিংকের রয়েছে আরও অনেক ধরনের সার্ভিস প্ল্যান। আবাসিক সংযোগে অফুরন্ত ডাটা ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও, রোমিং কিংবা মেরিটাইম সার্ভিসগুলোতে ডাটার পরিমাণ নির্দিষ্ট করা থাকে।


ব্যান্ডউইথ 

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো ব্যান্ডউইথ। স্যাটেলাইট সার্ভিস হলেও, এশিয়ান-আফ্রিকান দেশগুলোর আইএসপিদের সাথে তুলনা করলে স্টারলিংকের ব্যান্ডউইথ খুবই ভাল। স্টারলিংকের দাবি অনুসারে, তাদের ব্যান্ডউইথ বিভিন্ন সার্ভিসপ্ল্যানের জন্য নিম্নরুপ। 





স্টারলিংক বাংলাদেশে আসলে কারা লাভবান হবেন? 

স্টারলিংক বাংলাদেশে আসলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ফ্রিল্যান্সাররা। বাংলাদেশের অনেক ফ্রিল্যান্সারই এমন স্থানে বসবাস করেন সেখানে বেশি টাকা খরচ করলেও, উচ্চ গতির ইন্টারনেট পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে স্টারলিংক হতে পারে তাদের জন্য একটা ভাল অপশন। কারণ স্টারলিংকের সংযোগ থাকলে বান্দরবন, এমনকি সুন্দরবনেও উচ্চগতির ইন্টারনেট পাওয়া যাবে। 


কিন্তু সমস্যা হলো, স্টারলিংকের সার্ভিস নিতে গেলে হার্ডওয়্যারের পেছনে যেই খরচ করতে হবে, তা অনেকের সামর্থ্যের বাইরে। এছাড়াও মাসিক খরচও হবে অনেক বেশি। মাসিক খরচটা হয়তো অনেক ফ্রিল্যান্সারই বহন করতে পারবেন। যেহেতু তাদের আয়ের পথই এটা। কিন্তু হার্ডওয়্যার খরচ প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে বহন না করলে, একার পক্ষে খুবই মুশকিল। আর বাংলাদেশের প্রায় সকল আইটি কোম্পানি ঢাকা কিংবা অন্যান্য বিভাগীয় শহরে অবস্থিত। যেখানে ইতোমধ্যে যথেষ্ট উচ্চ গতির ইন্টারনেট আছে। 


কিন্তু তবুও হয়তো কিছু কোম্পানি স্টারলিংক সার্ভিসে দিকে ঝুকবে। বা অন্তত ব্যাকআপ হিসেবে বিবেচনা করবে। কেন?



কারণটা বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ২০২৪ এর জুলাই মাসে। জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালীন প্রায় এক সপ্তাহ ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায়, এদেশের আইটি সেক্টর ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ে। ছোটখাটো ফ্রিল্যান্সার থেকে শুরু করে, বিশাল বড় কোম্পানি, সবাই প্রচন্ড সমস্যার শিকার হয়। কারণ এই ইন্ডাস্ট্রির বেশিরভাগ গ্রাহক হলো বিদেশী। আর এ ধরনের কাজের জন্য ডেডলাইন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই সেই ৭দিনের ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটে, অনেক ফ্রিল্যান্সারই তার সকল ক্লায়েন্ট হারিয়েছেন। অনেক কোম্পানি হারিয়েছে অসংখ্য অর্ডার। এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে বড় কোম্পানিগুলোর একটা ব্যাকআপ প্ল্যান রাখা অস্বাভাবিক কিছু নয়। 



এসবের বাইরে বাংলাদেশের অবস্থিত বিভিন মিশন, হাইকমিশন, দূতাবাস থেকে শুরু করে অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান মিলে একটি ছোট কাস্টমার বেজ (Customer Base) রয়েছে।  



সরকার কেন স্টারলিংক আনতে আগ্রহী?

বাংলাদেশে স্টারলিংক আনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু দেশের প্রাইভেট সেক্টরের চেয়েও সরকারি আগ্রহ কেন বেশি? এই প্রশ্নের জবাবটা একদম সরাসরি দিয়েছেন বিডা (BIDA) এর এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। আর কারণটা খুব পরিষ্কার, যাতে ভবিষ্যতে কেউই বাংলাদেশকে বিশ্ব থেকে পুরোপুরি আলাদা করতে না পারে, সেজন্যই স্টারলিংক আনা হচ্ছে দেশে। এছাড়া প্রেস সচীব শফিকুল আলমের কথা অনুসারেও, এটিই বাংলাদেশে স্টারলিংক আনার সবচেয়ে বড় কারণ। 

Previous Post

Next Post

Related Posts

বাংলাদেশের নতুন সংবিধান আর আমেরিকার সংবিধানের মিল...

11-03-2025

Sustainable Development

বাংলাদেশের নতুন সংবিধান আর আমেরিকার সংবিধানের মিল...

বাংলাদেশের সংবিধান সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা...

Read More
চাকরির পাশাপাশি সাইড বিজনেস শুরু করার কার্যকর উপায়

10-03-2025

Sustainable Development

চাকরির পাশাপাশি সাইড বিজনেস শুরু করার কার্যকর উপায়

বর্তমান সময়ে শুধুমাত্র একটি চাকরির আয়ে আর্থিক...

Read More
কীভাবে এআই (AI) ভিত্তিক ব্যবসা শুরু করবেন?

02-03-2025

Sustainable Development

কীভাবে এআই (AI) ভিত্তিক ব্যবসা শুরু করবেন?

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা...

Read More

Trending

About MAWblog

MAWblog strives to provide a platform for authors, reporters, business owners, academics, people who do writing as a hobby and concerned citizens to let their voices be heard by a wider community. Our goal is to publish contents that are in line with our core goals of promoting sustainable business practices, improving community harmony and facilitating knowledge sharing and ethical labour market practices.

We invite you to write and publish under any of our nine chosen categories and make an impact towards building a better and more sustainable future.

Sign Up for Our Weekly Fresh Newsletter