Print World Header Banner

Sustainable Development

বাংলাদেশের নতুন সংবিধান আর আমেরিকার সংবিধানের মিল কতটুকু? তুলনা ও বাস্তবতা

Written by: এস এম নাহিয়ান

11-03-2025

বাংলাদেশের নতুন সংবিধান আর আমেরিকার সংবিধানের মিল কতটুকু? তুলনা ও বাস্তবতা


বাংলাদেশের সংবিধান সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে প্রায় দুই মাস। এর মধ্যে হয়েছে অনেক জল্পনা কল্পনা, অনেক বিশ্লেষণ। কেউ কেউ আবার বলেছেন প্রস্তাবিত সংশোধনের মাধ্যমে, এদেশের সংবিধান আবার অন্য কোনো দেশের সংবিধানের আদলে হয়ে যাচ্ছে কিনা। এক্ষেত্রে উঠে এসেছে আমেরিকার নামও। কিন্তু আদৌ কি এর কোনো ভিত্তি আছে? সে প্রশ্নের উত্তরই জানবো আমরা আজকের লেখাতে। 

সংবিধানের তুলনামূলক বিশ্লেষণ একটি বিশাল এবং সময়সাপেক্ষ কাজ। তাই সে পথে না গিয়ে আজকের আলোচনা, প্রধান কিছু বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে। বিশেষত সুপারিশকৃত সংশোধনগুলো কোনোভাবে আমেরিকার সংবিধানের সাথে মিলে যায় কি না, মিলে গেলেও তা যৌক্তিক কি না সেটাই কিন্তু মূখ্য বিষয়। 


১। উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ 

সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুসারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো অনেকটাই পরিবর্তন হতে চলেছে। এর ভেতর অন্যতম বড় পরিবর্তনটা হবে আইন বিভাগে। বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থা এককক্ষ  থেকে দ্বিকক্ষীয় তে পরিবর্তিত হচ্ছে। এই দ্বিকক্ষীয় সংসদ বাংলাদেশের জন্য কেমন হবে সে নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। 

কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের এটা মনে রাখতে হবে যে, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা শুধু আমেরিকাতে নেই। আমেরিকা, ব্রিটেন, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, ভারত, জার্মানি, নেপাল, পাকিস্তানসহ অনেক দেশেই এ ব্যবস্থা রয়েছে।   


চিত্রঃ আমেরিকান কংগ্রেস ও যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট 


আমেরিকান সিনেট

কিন্তু আমেরিকার সাথে যদি বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সংবিধানের মূল পার্থক্য ধরতে চাই, সেক্ষেত্রে আগে আমেরিকান কংগ্রেস সম্পর্কে জানা জরুরী। আমেরিকার সংবিধান অনুযায়ী সে দেশের সংসদ পরিচিত ‘আমেরিকান কংগ্রেস’ নামে। 

এই কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ পরিচিত ‘হাউজ অফ রিপ্রেসেন্টেটিভ’ (House of Representative) নামে। নিম্নকক্ষে রয়েছে ৪৩৫টি আসন। প্রতিটা রাজ্যে কতগুলো আসন থাকবে সেটা নির্ভর করে ওই রাজ্যের মোট জনসংখ্যার উপর। অর্থাৎ রাজ্যের জনসংখ্যা বেশি হলে সংসদে আধিক্যও বেশি। এই নিম্নকক্ষের প্রত্যেক সদস্য সরাসরি জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। 

অন্যদিকে উচ্চকক্ষ পরিচিত ‘দি সিনেট’ নামে। প্রতিটি রাজ্যেই সিনেটর দুইজন। সিনেটর সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার হয়েছিলো মূলত আমেরিকার যেসব রাজ্যের জনসংখ্যা কম, তাদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য। আমেরিকান সংবিধানের ১৭শ সংশোধন অনুযায়ী, সিনেটররা জনগণের সরাসরি ভোর্টে নির্বাচিত হন। 


 

চিত্রঃ আমেরিকান সিনেট ম্যাপ 


সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব

বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর সাথে মূল পার্থক্যটা এই নির্বাচনী প্রক্রিয়াতেই। সংবিধান কমিশনের সুপারিশে ‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ এর কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের নিম্নকক্ষের প্রতিনিধিরা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হলেও, উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হবেন মোট প্রাপ্ত ভোটের শতাংশ হারে। 

বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করা যাক। ধরা যাক ‘ক’ দল জাতীয় নির্বাচনে মোট ২০% ভোট পেয়েছে। কিন্তু প্রতিটি আসনেই তাদের থেকে ‘খ’ দলের ভোট বেশি। ফলে প্রতিটি আসনে ‘খ’ দল বিজয়ী হয়েছে। সরাসরি নির্বাচন পদ্ধতিতে এই সমস্যাটা দেখা যায়। গণতন্ত্রকে অনুসরণ করতে যেয়ে সংখ্যালঘুদের মতামত সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়। এটি যাতে না হয় এজন্যই উচ্চকক্ষের ১০০টি আসন জাতীয় নির্বাচনে পাওয়া মোট ভোটের শতাংশ হারে বিভাজিত হবে। অর্থাৎ ২০-২৫% ভোট পেয়েও শুধুমাত্র আসন জিততে না পারার কারণে কোনো দল বা গোষ্ঠী পিছিয়ে থাকবে না। 

এই পদ্ধতিটি আমেরিকা, ভারত, ব্রিটেন সবকয়টি দেশের পদ্ধতি থেকেই আলাদা। 


২। প্রধানমন্ত্রী 

প্রস্তাবিত সংস্কার অনুসারেও বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হবেন প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ এদিক দিয়েই সবচেয়ে বড় পার্থক্য থেকে যাচ্ছে। আমেরিকার সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর কোনো পদ নেই। তবে এর বাইরেও বেশ বড় কিছু পার্থক্য রয়েছে।

সংবিধান কমিশনের প্রস্তাবনা অনুসারে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাসের জন্য একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যাতে ভবিষ্যতে কেউ স্বৈরাচারিতা দেখাতে না পারে সেজন্য দলের প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রীকে আলাদা করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের কোনো বিধান আমেরিকান সংবিধানে নেই। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পাশাপাশি রিপাবলিকান দলের প্রধান হিসেবেও দিব্যি দায়িত্ব পালন করছেন। 


এছাড়াও বাংলাদেশের সরকার প্রধান নির্বাচিত হবেন নিম্নকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের পছন্দ অনুসারে। কিন্তু আমেরিকান সরকারপ্রধান নির্বাচিত হন ইলেক্টোরাল কলেজ সিস্টেমের উপর নির্ভর করে। তবে এসবে অমিল থাকলেও, দুইবারের বেশি একজন ব্যক্তি সরকারপ্রধান হতে পারবেন না, এই সংস্কারের সাথে আমেরিকান সংবিধানের মিল রয়েছে। 


৩। ইলেক্টোরাল কলেজ (Electoral College) পদ্ধতি 

বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোতে ইলেক্টোরাল কলেজের বিষয়টিও উঠে এসেছে। এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার সাথে আমেরিকান রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার বেশ মিল দেখা গেছে। রাষ্ট্রপতির নির্বাচক মন্ডলী বা ইলেক্টোরাল কলেজ গঠিত হবেঃ 


১। ‘আইনসভার দুই কক্ষের সকল সদস্যদের একটি করে ভোটে 

২। প্রতিটি জেলা সমন্বয় কাউন্সিলের একটি করে সামষ্টিক ভোটে। ৬৪টি জেলার জন্য ৬৪টি ভোট থাকবে। 

৩। প্রতিটি ‘সিটি কর্পোরেশন সমন্বয় কাউন্সিল’ সামষ্টিক ভাবে একটি করে ভোটে। 


এর সাথে যদিও আমেরিকান ইলেক্টোরাল কলেজের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। আমেরিকান ইলেক্টোরাল কলেজ গঠিত হয়ঃ 


১। নিম্ন কক্ষের ৪৩৫জন সদস্য নিয়ে। 

২। ১০০ জন উচ্চ কক্ষের সিনেটর নিয়ে

৩। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির ৩টি ইলেক্টোরাল কলেজ 


সব মিলিয়ে আমেরিকান ইলেক্টোরাল কলেজের সংখ্যা ৫৩৮টি। 


চিত্রঃ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ 


অর্থাৎ আমেরিকান ইলেক্টোরাল কলেজ ও বাংলাদেশের ইলেক্টোরাল কলেজের গঠন পদ্ধতি কিছুটা আলাদা। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মূল প্রক্রিয়াটিতে মিল রয়েছে। তবে আরও একটি বেশ বড় বিষয়ে মিল রয়েছে। সেটি হলো, এবারের সংস্কার কমিশনের রিপোর্টে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ৫ বছর থেকে ৪ বছরে নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। 


আরও যা যা পরিবর্তন আসছে 

এসবের বাইরেও প্রস্তাবনা অনুসারে আরও অনেক ধরনের সংশোধনী আসতে পারে। যেমন পরিবর্তিত হচ্ছে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’ শব্দটি। চারটির বদলে নতুন পাঁচটি মূলনীতিতে গঠিত হবে সংবিধান। মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষার্থে নেওয়া হচ্ছে বেশ কিছু পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে শুরু করে, অভিশংসন, নির্বাহী বিভাগ, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠন সহ অন্তর্বর্তী সরকারের বিধান আনয়ন সহ আরও নানা ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে নতুন সংবিধানে। 


একই সাথে পরিবর্তিত হচ্ছে বিচার বিভাগ ও স্থানীয় সরকারের কাঠামো, গঠিত হচ্ছে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস এবং একাধিক সাংবিধানিক কমিশন। এছাড়াও বাদ যাচ্ছে সংবিধানের ৫ম, ৬ষ্ঠ, এবং ৭ম তফসিল। 

শেষকথা 

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সংবিধানকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের সংবিধানের আদলে পরিবর্তন করা হবে, এমনটি বলার কোনো সুযোগ নেই। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ সহ স্থায়ী সংস্কারের লক্ষ্যে বলতে গেলে পুরো সংবিধানকেই ঢেলে সাজানো হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সংবিধানের সাথে বিভিন্ন অংশে কিছুটা মিল থাকতেই পারে। কিন্তু একে ঢালাও ভাবে কোনো একটি দেশের অনুকরণ বলার কোনো ভিত্তি নেই। 

Previous Post

Next Post

Related Posts

বাংলাদেশে স্টারলিংক আসায় কাদের লাভ? কত খরচ হবে...

13-03-2025

Sustainable Development

বাংলাদেশে স্টারলিংক আসায় কাদের লাভ? কত খরচ হবে...

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড মুহাম্মদ ইউনূস, ইলন...

Read More
চাকরির পাশাপাশি সাইড বিজনেস শুরু করার কার্যকর উপায়

10-03-2025

Sustainable Development

চাকরির পাশাপাশি সাইড বিজনেস শুরু করার কার্যকর উপায়

বর্তমান সময়ে শুধুমাত্র একটি চাকরির আয়ে আর্থিক...

Read More
কীভাবে এআই (AI) ভিত্তিক ব্যবসা শুরু করবেন?

02-03-2025

Sustainable Development

কীভাবে এআই (AI) ভিত্তিক ব্যবসা শুরু করবেন?

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা...

Read More

Trending

About MAWblog

MAWblog strives to provide a platform for authors, reporters, business owners, academics, people who do writing as a hobby and concerned citizens to let their voices be heard by a wider community. Our goal is to publish contents that are in line with our core goals of promoting sustainable business practices, improving community harmony and facilitating knowledge sharing and ethical labour market practices.

We invite you to write and publish under any of our nine chosen categories and make an impact towards building a better and more sustainable future.

Sign Up for Our Weekly Fresh Newsletter